সমন্বিত চাষের ধারণা 

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের গ্রামের প্রায় বাড়িতেই হাঁস - মুরগি , গরু - ছাগল পালন করা হয় । আবার সে সাথে অনেকের বাড়িতে রয়েছে পুকুর যেটি বােয়ামােছা , রান্নাবান্না , গােসল ইত্যাদি গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত হয় । সনাতন পদ্ধতিতে এই সব পুকুরে মাছও লালন করা হয়। এসব হাঁস - মুরগি , মাছ পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখে।

পুকুরের উপর ঘর করে যদি হাঁস - মুরগি রাখা যায় তবে এদের জন্য অতিরিক্ত জায়গার দরকার হয় না । 

আবার গরুর গােবর ও হাঁস - মুরগির বিষ্ঠা পুকুরে সার হিসাবে ব্যবহার করা যায় । সেইসাথে হাঁস - মুরগির উচ্ছিষ্ট খাদ্য পুকুরে ফেলে দিলে তা মাছের সম্পূরক খাদ্যের যােগান দেয় ।
অব্যবহৃত পুকুরের পাড়ে ফল - মূল এবং শাকসবজির চাষও করা যায় যেখানে পুকুরের তলার অতিরিক্ত কাদা ( পচা জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ ) সার হিসাবে ব্যবহার করা যায় ।
অন্যদিকে ফলমূল ও শাকসবজির ঝরাপাতা কমপােস্ট সার হিসাবে পুকুরে ব্যবহার করা হয় । আবার কৃষকের ধানের জমিতে যে কয়েকমাস পানি থাকে সে সময়ে ।
ধানের পাশাপাশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব ।
এ ক্ষেত্রে মাছের বিষ্ঠা ক্ষেতের উর্বরতা বাড়াতে সাহায্য করে ।
এই মাছ ধানের ক্ষতিকারক পােকামাকড় খেয়ে ফেলে এবং মাছের চলাচল জমিতে আগাছা জন্মাতে বাধা দেয়।
এভাবে যখন একই জমিতে একই সময়ে একাধিক ফসল উৎপাদন করা হয় তাকে সমন্বিত চাষ বলে।

সমম্বিত চাষের গুরুত্ব ।
একই জমিতে একই সময়ে অল্প খরচে একাধিক ফসল পাওয়া যায় ।
ফলে বাড়তি খাদ্য উৎপাদিত হয় ।
একই ফসল অপর ফসলের সহায়ক হিসাবে কাজ করে ।
পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে ।
সার ব্যবহারের খরচ কমে ।
শ্রমের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হয় ( একটি ফসলের জন্য যে শ্রম প্রয়ােজন , সেই একই শ্রমে একাধিক ফসল উৎপাদিত হয় ) ।
সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় ও অপচয় রােধ হয় ।
ঝুঁকি কম থাকে অর্থাৎ কোনাে কারণে একটি ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হলে অন্য উৎপাদন কার্যক্রমের মাধ্যমে সে ।
ক্ষতি অনেকটা পুষিয়ে নেওয়া যায় ।
নিচে আমরা দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বিত মাছ চাষ পদ্ধতি ( সমন্বিত মাছ - হাঁস / মুরগি চাষ এবং ধানক্ষেতে মাছ ও গলদা চিংড়ি চাষ ) সম্পর্কে জানব । 


ক ) সমন্বিত মাছ ও হাঁস / মুরগি চাষ
মাছ ও হাঁস মুরগির সমন্বিত চাষের সুবিধা

১. পুকুরের উপর হাঁস / মুরগির ঘর তৈরি করা হয় বলে আলাদা জায়গায় প্রয়ােজন হয় না ।
২. হাঁস / মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি পুকুরে পড়ে যা মাছ চাষের জন্য উৎকৃষ্ট জৈব সার , এই পদ্ধতিতে পুকুরে বাইরে থেকে কোনাে সার দেওয়ার দরকার নেই ।
৩. হাঁস / মুরগির উচ্ছিষ্ট খাদ্য সরাসরি পুকুরে পড়ে যা মাছ খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে ফলে মাছের জন্য আলাদা কোনাে সম্পূরক খাদ্য দেওয়ার প্রয়ােজন হয় না ।
৪. হাঁস পুকুরের পােকামাকড় ও ব্যাঙাচি খেয়ে পুকুরের পরিবেশ ভালাে রাখে ।
৫. হাঁস পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটে বলে বাতাস থেকে অক্সিজেন পানিতে মেশে ফলে পানিতে অক্সিজেনের সমস্যা হয় না ।
৬. একই জায়গা থেকে মাছ , মাংস ও ডিম পাওয়া যায় ফলে অধিক খাদ্য উৎপাদন ও সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় ।

সমন্বিত চাষের ধারণা কি


পুকুর নির্বাচন ও প্রস্তুতি : খুব ছােট আকারের পুকুর সমন্বিত মাছ ও হাঁস / মুরগি চাষের জন্য তেমন থেকে ১.৮ মিটার ( ৪-৬ ফুট ) পানি থাকে এমন পুকুর নির্বাচন করাতে হবে ।
এরপর যথাযথ নিয়মে মাছ |
চাষের জন্য পুকুর প্রস্তুত করে নিতে হবে ।
তবে সমন্বিত হাঁস - মুরগি ও মাছ চাষে পুকুর প্রস্তুতিকালীন সময়ে সার প্রয়ােগের প্রয়ােজন নেই ।
চুন দেওয়ার ৭ দিন পর পুকুরের উপর বানানাে ঘরে হাঁস / মুরগির বাচ্চা মজুদ করতে হবে । হাঁস / মুরগির বাচ্চা মজুদের ৭-১০ দিন পর পুকুরে মাছের পােনা ছাড়তে হবে।

হাঁস - মুরগির ঘর নির্মাণ.
ও খরচ কমানাের জন্য স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত বাঁশ , কাঠ ও ছন দিয়ে এক চালা বা দো চালা ঘর তৈরি করা যায় ।
ঘরটি পাড় থেকে ১.২ থেকে ১.৫ মিটার ( ৪-৫ ফুট ) ভিতরে পানির উপর হবে । যেন শুকনাে মৌসুমে পানি কমে গেলেও বিষ্ঠা ও উচ্ছিষ্ঠ খাদ্য মাটিতে না পড়ে পানিতে পড়ে ।
পানির উপরিভাগ থেকে ঘরের মেঝের দুরত্ব ০.৪৬-০.৬ মিটার ( ১.৫-২ফুট ) এবং মেঝে থেকে ঘরের চালার উচ্চতা হবে ১.২-১.৫ মিটার ( ৪-৫ ফুট ) ।
ঘরের ভিতরে পর্যাপ্ত আলাে - বাতাস চলাচলের জন্য চালা ও ঘরের বেড়ার মাঝের জালের মতাে বেড়া বা জাল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে ।
ঘরের মেঝে বাঁশের বাতা দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে ।
এক বাতা থেকে অন্য বাতার দূরত্ব হবে ১ সেমি । এতে করে মুরগির বিষ্ঠা ও উচ্ছিষ্ঠ সরাসরি পানিতে পড়বে কিন্তু মুরগির পা বাতার ফাকে ঢুকে আঘাত প্রাপ্ত হবে না।
হাঁস / মুরগির ঘর অনেকসময় পুকুরের পাড়েও তৈরি করা হয় ।

হাঁস - মুরগির জাত ও সংখ্যা নির্ধারণ: 
প্রতি শতাংশ পুকুরের জন্য উন্নতজাতের ২ টি হাঁস বা মুরগি ( ব্রয়লার বা লেয়ার ) পালন করা যায় ।

হাঁস - মুরগির খাদ্য :
বাচ্চা অবস্থায় ৯০ দিন পর্যন্ত প্রতিটি হাঁসের জন্য প্রতিদিন ৬০-৯০ গ্রাম এবং পরবর্তীতে ১১০-১২৫ গ্রাম সুষম খাদ্য দিতে হবে ।
হাঁসকে খাদ্য খাওয়ানাের সময় প্রয়ােজনমতাে পানি মিশিয়ে দিতে হবে ।
ব্রয়লার মুরগিকে প্রয়ােজন অনুযায়ী সব সময় খাবার প্রদান নিশ্চিত করতে হবে ।
প্রতিটি লেয়ার মুরগির জন্য ৪ সপ্তাহ পর্যন্ত ৮০-৯০ গ্রাম এবং পরবর্তীতে ১১০-১২০ গ্রাম হারে দৈনিক খাবার প্রদান করতে হবে ।
খাদ্য ও পানি খাওয়ানাের জন্য পৃথক পৃথক পাত্র ব্যবহার করতে হবে ।

হাঁস - মুরগির রােগবালাই দমন :
হাঁস / মুরগির রােগ হতে পারে । রােগ হলে নিকটস্থ পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে । রােগ প্রতিরােধের জন্য হাঁস - মুরগির ঘর সবসময় শুকনাে রাখতে হবে । ঘরের মেঝে

Post a Comment

Previous Post Next Post