হযরত উসমান ( রা ) এর হত্যার ঘটনা

পূর্বে উল্লিখিত কারণসমূহে হযরত উসমান ( রা ) -এর খিলাফতের শেষের দিকে দেশময় গােযােগ বাড়তে থাকে । হযরত উসমান ( রা ) সমস্ত গরদের এক পরামর্শ সভা আহবান করেন । মতবিরােধ নিরসনের উপায় বের করাই ছিল এ পরামর্শ সভার মূল লক্ষ্য । গভর্নরগণ সমবেত হন , অধিকাংশ গভর্নরই বিদ্রোহীদের প্রতি কঠোরতা প্রদর্শনের কথা বলেন ।

হযরত উসমান ( রা ) এর হত্যার ঘটনা


কিন্তু হযরত উসমান ( র ) বলেন , এটা আমার দ্বারা সম্ব হবে না । আমি যথাস কোমলতা ও ক্ষমতাশীলতার সাথে চেষ্টা করব । আমীরে মুয়াবিয়া ( রা ) তাকে বলেন- আপনি মদিনা ছেড়ে আমার সাথে সিরিয়া চলুন । অন্যথায় ভয়াবহ বিপদ দেখা দিতে পারে । তিনি জবাব দেন । “ আমার মাথা কাটা গেলেও আমি প্রিয় নবি ( স ) -এর মদিনা ছেড়ে যাৰ না । ” 

মুয়াবিয়া ( রা ) বলেন , নিরাপত্তা বাহিনী পাঠিয়ে দেই । হযরত উসমান ( রা ) বলেন , “ আমার কাছে নবির প্রতিবেশীদের কষ্ট দেওয়াও পছন্দ নয় । এভাবে তিনি গর্ভনরদের বিদায় করে দিলেন । এদিকে বিদ্রোহীরা ঠিক করে পরামর্শ সভা থেকে গর্ভর্নরা ফিরে এলে তারা তাদেরকে প্রদেশসমূহে প্রবেশ করতে দেবে না । গণবিদ্রোহ শুরু করবে । তাদের ষড়যন্ত্র সফল হল না । তবে কূফার গর্নর হযরত সাইদ ইবনুল আস ( রা ) কে কুফায় প্রবেশ করতে দিল না । 

হযরত উসমান ( রা ) কুফা বাসীদের ইচ্ছানুসারে হযরত আবু মুসা আশআরীকে কুফায় গভর্নর নিযুক্ত করেন । গভর্নরদের ফিরে যাওয়ার পর হযরত উসমান ( রা ) কেন্দ্র থেকে তদন্ত দল প্রত্যেক প্রদেশে পাঠান । মিসর ব্যতীত অন্যসব প্রদেশের তদন্ত রিপাের্ট বিদ্রোহিদের বিপক্ষে গেল । এসময় হঠাৎ মিসরের কিছু লােক মদিনায় এসে খলিফার কাছে মিসরের শাসক আবদুল্লাহ ইবনে আবী সাফাহর নির্যাতনের অভিযােগ পেশ করে । হযরত উসমান ( রা ) মিসরের শাসকের তিরস্কার করে চিঠি লেখেন । এতে ক্ষমা প্রার্থনা বা ভবিষ্যতের জন্য সাবধান হওয়ার পরিবর্তে সে অভিযােগকারীদের নির্মমভাবে প্রহার করল । ফলে একজন মারা গেল । এ ঘটনার প্রতিবাদে ৬২৬ খ্রিঃ মিসর থেকে প্রায় সাতশ লােক মদিনায় গিয়ে মসজিদে নববিতে নির্যাতনের কাহিনী বর্ণনা করে । একই সময় বসরা ও কুফার বিদ্রোহীরাও এসে জমায়েত হলাে গােলযোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে ।

 হযরত উসমান ( রা ) সােলযােগ নিরসন ও জনগণের যথার্থ অভিযােগের প্রতিবিধান করতে সব সময়ই তৈরি ছিলেন । তিনি এ জনসমাবেশের খবর শুনে হযরত আলী ( রা ) -কে ডেকে বললেন , আপনি এসব লােককে বুঝিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিন । আমি তাদের ন্যায্য দাবিসমূহ মেনে নিতে প্রস্তুত আছি । তিনি মিসরের গভর্নর আব্দুললাহ ইবনে আবী সারাহকে পদচ্যুত করে মিসরীয় প্রতিনিধি দলের ইচ্ছানুসারে তার স্থানে হযরত মুহম্মদ ইবনে আবু বকর ( রা ) -কে মিসরের গভর্নর নিয়োগ করেন । এতে বিদ্রোহীরা ফিরে যায় । ঘটনা তদন্তের জন্য মুহাজির ও আনসারদের একটি দলও তাদের সাথে মিসর যাত্রা করে । জুমআর দিন

 হযরত উসমান ( রা ) মসজিদে ভাষণ দিলেন এবং বিস্তারিতভাবে তাঁর সংস্কার পরিকল্পনা ও ভবিষৎ কর্মপন্থা তুলে ধরলেন । লােকজন সবাই আনন্দিত হলাে এই ভেবে যে , এখন বিরােধ ও বিপর্যয়ের সমাপ্তি ঘটবে । মিসরীয় প্রতিনিধি দলটি মদিনা থেকে রওয়ানা হয়ে সবেমাত্র তিন মাইল পথ এগিয়ে গেছে । এমন সময় দেখা গেল একজন হাবশী দাস উটের পিঠে চড়ে অতি দ্রুত মিসরের পথে এগিয়ে যাচ্ছে । সন্দেহ হওয়ায় তাকে পাকড়াও করা হল । সে বলল আমীরুল মুমিনীন

 হযরত উসমান ( রা ) আমাকে মিসরের গর্ভনরের কাছে পাঠিয়েছেন । তার কথায় সন্দেহ দেখা দিল । দেহ তল্লাশি করে তার নিকট হযরত উসমানের সীল মােহরকৃত গভর্নর ইবনে আবী সারাহকে দেয়ার জন্য একটি চিঠি পাওয়া গেল । তাতে লেখা ছিল 

মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর(রা.) ও তাঁর সঙ্গী - সাথীদের হত্যা করে ফেল । এ চিঠি দেখে মুহম্মদ ইবনে আবু বকর ( রা ) ও অন্যান্যরা উত্তেজিত হয়ে মদিনায় ফিরে আসেন । হযরত তালহা , জুবাইর , সাদ ও আলী ( র ) -কে ডেকে চিঠি লেখান । তারা সবাই চিঠি , উট ও দাসটিকে নিয়ে হযরত উসমান ( রা ) -এর কাছে গেলেন । হযরত উসমান ( রা ) কসম ( শপথ ) করে চিঠি অস্বীকার করলেন , পরে জানা গেল , পত্রদাতা হচ্ছে মারওয়ান । হযরত উসমান ( রা ) এর ব্যাপারে সবাই সন্দেহমুক্ত হলেন । কিন্তু বিদ্রোহিরা দাবি করে বসল যে , মারওয়ানকে আমাদের হাতে ছেড়ে দেয়া হােক । হযরত উসমান ( রা ) তা করতে রাজি হলেন না । এ পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বেড়ে চলে । এবার বিদ্রোহিরা খলীফার অপসারন দাবি করে বসল , উত্তরে তিনি বললেন : আমার মধ্যে জীবন থাকতে আমি আল্লাহর দেয়া খিলাফত নিজ হাতে খুলে ফেলব না এবং মহানবি ( স ) এর অসীয়ত মতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্য অবলম্বন করব । ” এরপর বিদ্রোহীরা অত্যন্ত কঠোরভাবে হযরত উসমানের বাসভবন অবরােধ করে রাখল । অবরােধ ৪০ দিন র্যন্ত অব্যাহত থাকল এবং তার বাড়িতে পানি পর্যন্ত পৌছানাে নিষেধ করে দেয়া হল । হযরত আলী ( রা ) অনেক কষ্টে কয়েকবার পানি পৌছান ।। হযরত উসমান ( রা ) বারবার বিদ্রোহীদের বুঝানাের চেষ্টা করেন , মর্মস্পর্শী ভাষণ দেন । কিন্তু বিদ্রোহীরা তাতে কোনাে রকম সাড়া দেয়নি । ভক্ত - অনুরক্ত এবং আনসার ও মুহাজিরগণ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুমতি চাইলেন । কিন্তু হযরত উসমান ( রা ) তাদেরকে সে অনুমতিও দেননি । হযরত আলী , হযরত তালহা , হযরত জুবাইর ও হযরত সাদ ( রা ) প্রমুখ তাদের কর্তব্য স্থির করতে পারছিলেন না । কারণ বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার অনুমতি নেই তারা তাদেরকে বুঝানাের চেষ্টা করলেন । কিন্তু খলিফার পদত্যাগ অথবা মারওয়ানকে হস্তান্তর ছাড়া তারা তাদের স্থান ত্যাগ করতে রাজি হয় নি । অবশেষে বাধ্য হয়ে হযরত আলী ( রা ) , হযরত তালহা ( রা ) , হযরত জুবাইর ( রা ) তাদের ছেলেদেরকে সশস্ত্র অবস্থায় হযরত উসমানের বাড়ি পাহারায় মােতায়েন করেন । প্রতিরােধ করতে গিয়ে ইমাম হাসান ( রা ) আঘাতপ্রাপ্ত হলেও আপন জায়গায় অনড় থাকেন । কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিলেন না । বিদ্রোহিরা দেখলেন , হজ্জের মওসুম শেষ হয়েছে । লােকজন শীঘ্রই মদিনায় ফিরে আসবে এবং সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে । যাবে । তারা সম্মুখের দরজা দিয়ে ঢুকতে না পেরে প্রাচীর টপকিয়ে ছাদে ওঠে হযরত উসমান ( রা ) -এর কাছে গিয়ে পৌঁছে । এদের সামনে ছিল মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর । তিনি হযরত উসমান ( রা ) -এর দাড়ি ধরে টান দেন । 

হযরত উসমার ( রা ) বললেন ভাতিজা তােমার পিতা হযরত আবু বকর ( রা ) যদি বেঁচে থাকতেন , তা হলে এদৃশ্য মােটেই পছন্দ করতেন না । একথা শােনামাত্র তিনি ফিরে যান । অন্যরা অগ্রসর হয়ে হামলা চালায় , একজন লােহার খণ্ড ও দ্বিতীয় জন বর্শা দিয়ে আঘাত করে । তখন তিনি কুরআন শরীফ পাঠ করছিলেন । তৃতীয়জন তরবারি দিয়ে আঘাত করে । স্ত্রী হযরত নায়েলা হাত দিয়ে তা ঠেকাতে গেলে তার তিনটি আঙ্গুল কেটে পড়ে যায় । তরবারির দ্বিতীয় আঘাতে হযরত উসমান ( রা ) -এর জীবন প্রদীপ নিভে যায় । ( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন ) । 

৩৫ হিজরির ১৮ যিলহাজ্জ জুমআর দিন আসরের সময় মােতাবেক ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জুন তারিখে হযরত উসমান ( রা ) । শাহাদাত বরণ করেন । লাশ দুদিন পর্যন্ত দাফনহীন অবস্থায় পড়ে থাকে , বিদ্রোহীদের ভয়ে কেউ অগ্রসর হওয়ার সাহস করল না । শনিবার রাতে কিছুসংখ্যক মুসলমান জীবন বাজি রেখে জানাযা আদায় করে জান্নাতুল বাকির পেছনে তার দেহ মােবারক দাফন করেন ।

 হযরত উসমান ( রা ) -এর হত্যাকাণ্ড ইসলামের ইতিহাসে একটি বেদনাবিধুর ঘটনা । তাঁর শাহাদাত ইসলামের ইতিহাসে সুদূর প্রসারী প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল । এটি একটি আলােড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা এবং তা ইসলামের পরবর্তী ইতিহাসের ধারাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে ।

Post a Comment

Previous Post Next Post